এসএসসি পরীক্ষায় নকল ও প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে এবার নজিরবিহীন প্রস্তুতি!

আগামী ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরিসহ দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নকলমুক্ত ও প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে এবার নজিরবিহীন প্রস্তুতি নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর জন্য ইতোমধ্যে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। যাতে পরীক্ষা চলাকালীন প্রতিটি কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায়। ক্যামেরার রেকর্ডিং কমপক্ষে ৩০ দিন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্র সচিব, পরিদর্শক এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও কঠোরভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশ্নফাঁস ও নকল প্রতিরোধে এ ধরনের উদ্যোগ ইতিবাচক। বিগত আওয়ামী সরকারের সময়ে বিভিন্ন পরীক্ষায় ছড়িয়ে পড়া নকল ও প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হোক। তাদের মতে, শুধু নকল বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়; পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও কোচিং নির্ভরতা কমানোর মতো বিষয়েও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

এবারের পরীক্ষায় অনিয়ম রোধে তাৎক্ষণিক পরিদর্শন কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ টিম গঠন করে বিভিন্ন কেন্দ্রে আকস্মিকভাবে অভিযান চালানো হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রশ্নফাঁসের আলামত পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ‘হেলিকপ্টার মিশন’র মাধ্যমে দুর্গম বা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত পরিদর্শনের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে। যা একেবারেই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।

এদিকে, আজ (শনিবার) থেকে শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন দেশের সবকটি শিক্ষা বোর্ড পরিদর্শন শুরু করছেন। সফরের সময় তিনি সংশ্লিষ্ট বোর্ড কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। পাশাপাশি পরীক্ষার সার্বিক প্রস্তুতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করবেন। মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ১৮ এপ্রিল অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে শিক্ষামন্ত্রী ঢাকায় বসে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সব জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং থানার ওসিদের সঙ্গে যুক্ত হবেন। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারাও এতে অংশ নেবেন। এই উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক সমন্বয় আরও জোরদার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশজুড়ে নকল ও অনিয়ম প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। দুর্গম, চরাঞ্চল, উপকূলীয় ও পাহাড়ি এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি থাকবে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভির পাশাপাশি ‘লাইভ মনিটরিং’ চালু করা হবে, যাতে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা যায়। প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে মুদ্রণ থেকে বিতরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। প্রশ্নপত্র ফয়েল প্যাক ও বিশেষ সিকিউরিটি খামে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। যা একবার খোলার পর পুনরায় ব্যবহারযোগ্য নয়। পরীক্ষা শুরুর ১৫ থেকে ২০ মিনিট আগে নির্ধারিত কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে খাম খোলা হবে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ যুগান্তরকে বলেন, পরীক্ষায় নকল কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটি শিক্ষাব্যবস্থার মূল নৈতিকতার পরিপন্থি। তাই নকল ও প্রশ্নফাঁস রোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। শিক্ষামন্ত্রী যে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তা ইতিবাচক এবং সময়োপযোগী বলেই মনে হয়। অতীতেও তিনি দায়িত্বে থাকাকালে নকলবিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সে অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো এবার আরও কঠোরভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করতে চাইছেন।

অভিভাবকরাও সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, এ ধরনের কঠোর তৎপরতা অব্যাহত থাকলে শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। নকল ও প্রশ্নফাঁস অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। কোচিং সেন্টারে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে। প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট চালু করার পরামর্শ দেন তারা।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এসএম কামাল উদ্দিন হায়দার যুগান্তরকে বলেন, প্রশ্নপত্র প্রস্তুতিসংক্রান্ত সব কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। প্রশ্নপত্র জেলা পর্যায়েও পৌঁছে গেছে এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মধ্যে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে নকলমুক্ত পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই। অতীতে শিক্ষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে যেভাবে নকল প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছিল, আগামীতেও আমরা সেই ধারা বজায় রাখব। বিভাগীয় শহরগুলোতে কেন্দ্র সচিব ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু পরীক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, ‘পরীক্ষায় কোনো ধরনের ‘গ্রেস মার্ক’ বা অনুকম্পার সুযোগ থাকবে না। পরীক্ষার্থীরা যা লিখবে, তার ভিত্তিতেই নম্বর দেওয়া হবে। আমরা মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন চাই, অযোগ্যদের পার করে দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে চাই।

এদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) কেন্দ্র সচিবদের জন্য একাধিক নির্দেশনা জারি করেছে। ঢাকা বোর্ডের ৩১ দফা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পরীক্ষা শুরুর পরপরই কেন্দ্রের ওয়াশরুম তল্লাশি করতে হবে এবং প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর তা পরিদর্শন করে পরিষ্কার রাখতে হবে। যাতে নকলের কোনো উপকরণ না থাকে। কোনো কেন্দ্রে ওয়াশরুমে নকল পাওয়া গেলে এর দায়ভার কেন্দ্র সচিবকেই নিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *